
শেরপুর বগুড়া
প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর, ২০২৬ - ১৮:১০
• পঠিত: ৮ বার

বিকেল হলেই পাঠাগারে হাজির হয় শিশু-কিশোর ও তরুণেরা। কেউ পড়ে গল্পের বই, কেউ ইতিহাস, জীবনী কিংবা ধর্মীয় বই। আবার কেউ পাঠ্যবইয়ের বাইরের নানা বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের আগ্রহ নিয়ে উল্টে দেখে বইয়ের পাতা। মাদক, মুঠোফোন ও অনলাইন গেমের আসক্তির সময়ে গ্রামের তরুণদের বইমুখী করতে বগুড়ার শেরপুর উপজেলার সিমাবাড়ি ইউনিয়নের বেটখৈর গ্রামে গড়ে তোলা হয়েছে শেখ নূর মুহাম্মাদ স্মৃতি পাঠাগার। বর্তমানে পাঠাগারটিতে বইয়ের সংখ্যা প্রায় চার হাজার।
২০২২ সালে কয়েকজন তরুণকে সঙ্গে নিয়ে পাঠাগারটি প্রতিষ্ঠা করেন শিক্ষক ও নিকাহ নিবন্ধক কাজী মুহাম্মাদ আলমগীর হোসাইন। শুরুতে নিজেদের উদ্যোগে ঘর তৈরি করে বই সংগ্রহের কাজ শুরু করেন তাঁরা। সরকারি গ্রন্থাগার থেকে নির্দেশনা নিয়ে প্রথম পর্যায়ে প্রায় ৫০০ বই সংগ্রহ করা হয়। পরে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বই সংগ্রহের উদ্যোগ নেন তাঁরা। একুশে বইমেলা ও সুধীজনদের কাছ থেকেও বই পেয়েছেন।
পাঠাগারটিতে গল্প, কবিতা, সাহিত্য, উপন্যাস, বিজ্ঞান, ইতিহাস, চিকিৎসা, প্রাণী ও ধর্মীয় বিষয়সহ বিভিন্ন ধরনের বই রয়েছে। প্রতিদিন বিকেল চারটা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত পাঠাগারটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে। প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ৩০ জন পাঠক এখানে বই পড়তে আসেন। শেরপুর উপজেলায় পাঠাগারের সংখ্যা পাঁচটি।
পাঠাগারটির প্রতিষ্ঠাতা কাজী মুহাম্মাদ আলমগীর হোসাইন বলেন, ‘আকাশসংস্কৃতির এই যুগে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি অন্য বিষয়েও জ্ঞান অর্জন করা প্রয়োজন। মানুষকে আলোকিত করার লক্ষ্য নিয়েই পাঠাগারটি করেছি। আমরা চাই, শিশু-কিশোরেরা বই পড়ুক, জানার পরিধি বাড়াক।’
পাঠাগারের কার্যক্রমের অংশ হিসেবে জাতীয় দিবস ও বিভিন্ন জাতীয় অনুষ্ঠান পালন করা হয়। গত মাসে সেখানে নজরুলজয়ন্তী উৎসবের আয়োজন করা হয়। ওই অনুষ্ঠানে শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইদুজ্জামান হিমু পাঠাগারটি পরিদর্শন করেন এবং এর উন্নয়নে সহযোগিতা দেন। তাঁর দেওয়া সহায়তায় পাঠাগারের কিছু উন্নয়নকাজ করা হয়েছে।
পাঠাগার প্রতিষ্ঠার অন্যতম সহযোগী আব্দুল খালেক বলেন, শিশু-কিশোরদের মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ বাড়ছে। মুঠোফোনের আসক্তি থেকে দূরে রেখে তাদের বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট করতে নিয়মিত উৎসাহ দেওয়া হয়। পাঠাগারে এসে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের বই পড়তে দেখে ভালো লাগে। আরও বেশি পাঠককে যুক্ত করতে তাঁরা বিভিন্নভাবে আমন্ত্রণ জানান এবং বই পড়তে উৎসাহিত করেন।
পাঠাগারের নিয়মিত পাঠক তামিম বলে, ‘প্রথমে বাবার চাপে এখানে আসতাম। পরে বিভিন্ন বই পড়ে ভালো লাগতে শুরু করে। এখন নিজে থেকেই আসি। মুঠোফোনের দিকে তাকিয়ে থাকার চেয়ে বই পড়তে বেশি আনন্দ লাগে।’
তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া কয়েকজন শিশুকেও পাঠাগারে ছোটদের উপযোগী বই পড়তে দেখা যায়। স্কুলপড়ুয়া পাঠক হুমাইজিদ বলে, ‘পাঠ্যবইয়ের বাইরেও এখানে নানা বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতে পারি। এই জ্ঞান ভবিষ্যতে আমাদের এবং দেশকে এগিয়ে নিতে কাজে লাগবে।’
পাঠাগারের গ্রন্থাগারিক হারুন রশিদ বলেন, পাঠাগার প্রতিষ্ঠার পর থেকে অনেক তরুণ এখানে আসছেন। তাঁদের মধ্যে পরিবর্তনও লক্ষ করছেন তাঁরা। মাদক ও মুঠোফোনের আসক্তি থেকে বেরিয়ে অনেকে বই পড়ার দিকে ঝুঁকছেন।
পাঠকদের আগ্রহ বাড়লেও পাঠাগারটিতে বই ও অবকাঠামোগত সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। উদ্যোক্তাদের হিসাবে, পাঠকদের চাহিদা পূরণ করতে অন্তত ১০ হাজার বই প্রয়োজন। এ জন্য বাংলা একাডেমি থেকে প্রায় দুই লাখ ৭৫ হাজার টাকা মূল্যের এক সেট বই কেনার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের।
এ ছাড়া বই রাখার র্যাক, আলমারি ও সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা করাও জরুরি। পাঠাগারটির প্রতিষ্ঠাতা আলমগীর হোসাইন জানান, ভবিষ্যতে নিজের জায়গায় বহুতল ভবন নির্মাণ করে একটি কক্ষ পাঠাগারের জন্য উন্মুক্ত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে তিনি সবার সহযোগিতা চান।
এ বিষয়ে শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইদুজ্জামান হিমু বলেন, গ্রাম পর্যায়ে পাঠাগার গড়ে তোলা একটি ভালো উদ্যোগ। বই পড়া থেকে আমরা অনেকটা দূরে সরে গিয়েছি। সে কারণে সামাজিক অস্থিরতা, মাদক বা অন্যান্য খারাপ নেশার প্রতি আসক্তি বাড়ছে। প্রত্যেক ইউনিয়নে ছোট পরিসরে হলেও একটি করে পাঠাগার করা এবং উপজেলা পরিষদের মধ্যেও একটি পাঠাগার করার পরিকল্পনা আছে। তাহলে তরুণ প্রজন্ম বই পড়ার প্রতি আগ্রহী হবে। আশা করি, সবার সহযোগিতা নিয়ে এটি করতে পারব।
