কপালে ঘাম ঝরিয়ে প্রবাসে কেটেছে জীবনের অনেকটা সময়। বুকের ভেতর স্বপ্ন ছিল—একটি স্বপ্নের ছাদ হবে, নিজের একটা পাকা ঘর হবে। কিন্তু বছরের পর বছর হাড়ভাঙা খাটুনি আর রক্ত জল করা উপার্জনেও সেই স্বপ্ন ডানা মেলেনি। খালি হাতে, বুকভরা হতাশা নিয়ে মাত্র ১০ দিন আগে দেশে ফিরেছিলেন পঞ্চগড়ের তরুণ তহিদুল ইসলাম (২৭)। অবশেষে সেই না-পাওয়ার অধরা দুঃখ ও বুকচাপা কষ্ট সইতে না পেরে নিজ ঘরের সিলিং ফ্যানের সঙ্গেই ঝুলিয়ে দিলেন নিজের নিথর দেহ।
আগামীকাল বুধবার দুপুরে পঞ্চগড় পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের নতুন গরুহাটি এলাকায় নিজ ঘর থেকে তহিদুলের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত তহিদুল ওই এলাকার সিরাজ ইসলামের ছেলে।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার রাতে তহিদুল প্রতিদিনের মতোই নিজ ঘরে ঘুমাতে যান। কিন্তু সেই ঘুম আর ভাঙেনি। পরদিন সকাল থেকে পরিবারের স্বজনেরা ডেকে ডেকে হয়রান হলেও ভেতর থেকে মেলেনি কোনো সাড়াশব্দ। অবশেষে দুপুর আনুমানিক ২টার দিকে তহিদুলের অবুঝ ভাতিজি ঘরের পেছনের ফাঁক দিয়ে ভেতরে তাকাতেই আঁতকে ওঠে—সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলছে তাহিদুলের নিথর দেহ। স্বজনদের আকুল কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো নতুন গরুহাটি এলাকা।
আদরের সন্তানকে হারিয়ে দিশেহারা বাবা সিরাজ ইসলাম কান্নাজড়িত কণ্ঠে নর্থ এক্সপ্রেস নিউজ-কে বলেন, "জীবনের সবটুকু দিয়ে আদরের সন্তানকে মানুষ করেছিলাম।
ভেবেছিলাম সে আমাদের মুখ উজ্জ্বল করবে। কিন্তু সেই আদরের সন্তানকেই আজ অকালে হারিয়ে ফেললাম! বাপের আগে সন্তানের এই চলে যাওয়া—এই তীব্র বেদনা আমি বাবা হয়ে কীভাবে সহ্য করব?"
ঘটনায় পুরো পঞ্চগড় জুড়ে নেমে এসেছে গভীর বিষাদ। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রবাসে বছরের পর বছর কষ্ট করেও তেমন টাকা জমাতে পারে নি, হাতে নগদ টাকা না থাকার কারনে পাকা বাড়ি বানাতে না পারার গভীর গ্লানি ও হতাশা তহিদুলকে গ্রাস করেছিল। দেশে ফেরার পর থেকেই সেই না-পাওয়ার কান্না বুকচাপা হয়ে তাঁকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত সেই মনস্তাত্ত্বিক কষ্ট সইতে না পেরেই তিনি আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে লাশ উদ্ধার করে। এ বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনার ময়নাতদন্তের জন্য লাশ পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে এবং বিষয়টি নিয়ে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
প্রবাসের রুক্ষ মরুভূমিতে স্বপ্ন বোনা পঞ্চগড়ের এই তরুণের এমন করুণ বিদায়ে স্তব্ধ স্বজন ও এলাকাবাসী। ঘরের চার দেয়ালে এখন কেবলই এক প্রবাসী যুবকের না-বলা দীর্ঘশ্বাস আর স্বজনদের অবিরাম কান্নার সুর।